রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০

English Version

রংপুর বিভাগে করোনায় সমন্বিত পদক্ষেপে বিজয় সুনিশ্চিত: আমারহেলথ ডটকম লাইভশোতে সম্মুখযোদ্ধারা

No icon স্পট লাইট

আমারহেলথ ডটকম রিপোর্ট, ৭ জুলাই, ২০২০: রংপুর বিভাগের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব, সম্মুখযোদ্ধা, করোনায় দিনরাত পরিশ্রম, মেধা বিনিয়োগ করছেন যাঁরা; তাদের সম্মিলন ঘটেছিল আমারহেলথ ডটকমের ৬জুলাই রবিবার রাত ১০টার লাইভশোতে।

রংপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও গাইবান্ধা এই ৮টি জেলা নিয়ে গঠিত রংপুর বিভাগ। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলানিকেতন রংপুর বিভাগে করোনাকালীন সময়টিতে কেমন চলছে দিনগুলো? প্রতিদিন বাড়ছে সংক্রমণ। লকডাউন, সচেতনতা, পরীক্ষা নিরীক্ষা, চিকিৎসার কি অবস্থা? আমরা যুদ্ধে জিতবো কিন্তু কীভাবে?

 বিভাগীয় আয়োজনের এই বিশেষ পর্বে রংপুর বিভাগ নিয়ে আমারহেলথ ডটকমের এই আয়োজনে প্রথিতযশা ব্যাক্তিবর্গ, চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা, সমাজকর্মী , সাংবাদিকরা কথা বলেছেন দীর্ঘক্ষণ, সঞ্চালনায় ছিলেন, ডা.অপূর্ব পন্ডিত, সম্পাদক, আমারহেলথ ডটকম।

 তাঁদের কথার মূল অংশটুকু নিয়েই আমাদের এই আয়োজন।

কেমন আছে রংপুরের জনতা? প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মামুনুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক,গুড হেলথ হসপিটাল, আহবায়ক, জনতার রংপুর জানান প্রথম দিকে, সারাদেশের মতো করোনায় মানুষের সচেতনতার অভাব ছিল না।  কিন্তু সময়ের তালে তালে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি উদ্যোগগুলো একধরনের সমন্বয়হীনতায় ভুগছে।মাস্ক পড়া, সামাজিক নিয়ম মেনে চলা কমছে আর ক্রমান্বয়ে বাড়ছে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজন ব্যাপক সমন্বয়। পেশাজীবী, চিকিৎসক, আইন রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা প্রশাসন সহ সমন্বয়ের অভাবে মানুষ বরং স্বাস্থ্যবিধি মানতে শিথিলতা দেখাচ্ছে। জনতার রংপুর থেকে বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় মানুষের কাছে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার সাধারণ মানুষ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হচ্ছে, বিদ্যুত বিভাগ সহ বিভিন্ন অফিসে। এখনো স্বাস্থ্য সংকটে ভুগা অন্যান্য রোগিদের চিকিৎসকের সেবাটি নিশ্চিত হচ্ছে না। চিকিৎসকরাও পিপিই এখনো ঠিকমতো পাচ্ছেনা। করোনার চিকিৎসকরা কতদিন ডিউটি করবে, কতদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবে সেটিও নিশ্চিত হচ্ছে না। আক্ষেপের সুরেই সৈয়দ মামুনুর রহমান বলেন, জনপ্রতিনিধিরা করোনাকালে সমন্বতি ব্যবস্থা নিবেন, সেটি আশা করেছিলাম, কিন্তু সেটি হয়নি।

সমন্বয়হীনতার যে বক্তব্য আমরা শুনলাম তার প্রেক্ষিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডা.আমিন আহমেদ খান, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), রংপুর বিভাগ বলেন,,প্রতিদিন করোনা সম্পর্কে নতুন নতুন কথা আসছে , বিশ্বের অনেক বাঘাবাঘা দেশেও করোনা নিয়ে বাজে অবস্থা চলছে। আমরা ১৭তম পর্যায়ে রয়েছি। আমাদের প্রতিটি জেলায়  জেলা প্রশাসক সভাপতি ও সিভিল সার্জনকে সদস্য সচিব করে সমন্বিত ভাবে কাজ করছি। রংপুর বিভাগে টোটাল সনাক্তকৃত সংখ্যা ৩৩৫৪ এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৯৯৪। বাংলাদেশের আর কোন বিভাগে ৫৯% রোগি সুস্থ হয়ে উঠে নাই এখনো। আমাদের সমন্বয়ের কারনেই এমনটি হয়েছে। আমাদের রংপুর বিভাগে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৬০ টি। স্বাস্থ্যবিধি সবার মানতে হবে। অনেক সময় বাসায় মৃত্যু হচ্ছে, হাসাপাতালে আসলে মৃত্যুর পর টেস্ট রেজাল্ট পজেটিভ আসছে। মানুষ তথ্য গোপন করছে, যেহেতু মানবিক আচরণ করা হচ্ছে না সমাজে, তাই এমনটি ঘটছে। মানবিক আচরন করতে হবে জনগনকে, এই জায়গাটি পুলিশ দিয়ে হবে না। উদাহরন দিয়ে যদি বলি একজন অসুস্থ নার্স যখন তার পজেটিভ আসলো, তাকে একা রেখে ৫ তালা ফ্ল্যাটের সবাই চলে গেলো। তারপর, আমরা তাকে এনে হাসপাতালে ভর্তি করালাম।মানুষকে মোটিভেট করতে হবে, জনগণকে অভয় দিতে হবে। আমাদের টোটাল ২৯৮৬৪টি টেস্ট হয়েছে, তাহলে ১২% পজেটিভ কেস সনাক্ত হয়েছে। যেটিও বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে ভাল। আমাদের দেশে অনেক মানুষ তাই সংক্রমণ এখনো অনেক কম, একে পজেটিভলি দেখতে হবে।  একটি ব্যাংকে ১ জন পজেটিভ আসলে পুরো ব্যাংকটির সবাইকে কোয়ারেনটাইনে নিতে হবে? তাহলে ব্যাংকিং চলবে কিভাবে? তারমানে এখানে সমন্বয় করতে হবে। তবে আমরা যে জায়গাটিতে ব্যর্থ হচ্ছি জনগণকে মেসেজ পাঠাচ্ছি, তারা মানছে না। সেটি ঠিক হতে হবে। আমাদের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা দেয়া ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ননডাক্তার মালিক, তারা ডাক্তারদের ডেকে নিয়ে গিয়ে কাজ করায়, সেখানে আমরা করোনা চিকিৎসার প্রায় পুরোটাই সরকারি ভাবে করছি তাতে পারছি না অনেক সময়। ডা.আমিন আহমেদ খান জানান, আমাদের প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজগুলোর আইসিইউ আছে, তারা কি করোনার সেবা দিচ্ছে? তারপরও মৃত্যুহার রংপুরে মাত্র ১.৭% যা বিশ্বের যে কোন দেশের এক্সেপ্টেবল রেটের চেয়েও কম। তাই আমি বলবো সমন্বয় রয়েছে বলেই এটি সম্ভব হচ্ছে।

দুজনের বক্তব্যেই উঠে এসেছে নাগরিকরা সচেতন না। কেন সচেতন হচ্ছে না নাগরিকরা? এমন প্রশ্নের জবাবে, অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু, আহবায়ক,করোনা প্রতিরোধ নাগরিক কমিটি,রংপুর বলেন, সমন্বয়ের অভাব, ঈদের সময় গার্মেন্টস কর্মীদের নিয়ে টম এন্ড জেরির খেলা চলেছে। কয়েক লক্ষ শ্রমিক আমাদের এখানে গার্মেন্টসএ কাজ করে। তারা পায়ে হেটে ময়মনসিংহ থেকে রংপুরে এসেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলতে বাধ্য হয়ে ছিলেন- কারা এধরনের সিদ্ধান্ত নেয় আমি জানিনা। নাগরিকরা নিয়ম নীতি মানতে চায় কিন্তু নেতাদের সমন্বয় নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যে নির্দেশমালা রয়েছে সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মিলে সমন্বিত ভাবে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে। কিন্তু সমন্বয় নেই। আমরা যারা সামাজিক কাজ করি,প্রতিনিয়ত সেই মার্চ মাসের পর থেকে কাজ করছি। হ্যন্ড সেনিটাইজার বিতরণ, মাইকিং, পোস্টারিং করে নাগরিকদের সচেতনতায় আমরা ভূমিকা রাখছি। একজন মানুষের চিকিৎসার পেছনে রাষ্ট্র কতটাকা খরচ করছে সেটি দেখার বিষয় এখন নয়। নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্যালুট জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আপনি যথেষ্ট ত্রাণ দিয়েছেন ,কিন্তু সেটির বন্টন ঠিকমতো হয়নি। রংপুর মেডিক্যালে প্রতিদিন ১৮৮টি টেস্ট করা হয়, অথচ ৯ হাজার স্যাম্পেল ডাম্পিং হয়ে আছে। আপনারা জানেন ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে সমন্বয়ক করে নিয়োগ দেয়া হলো। সেই সচিব সাহেব মাত্র ১ বার এসেছেন, তাহলে সমন্বয়টি কিভাবে হবে আসলে?

ডা. গুলশান আক্তার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রেসিডেন্ট এন্ড সিইও,পিয়ারল্যাস ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, কানাডা।  তিনি রংপুর মেডিক্যালের ছাত্রী, দিনাজপুরে বাড়ি, সেখানে রয়েছে তার পরিবার পরিজন, দিনাজপুরের করোনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে যেয়ে বলেন- একাত্তরে আমরা জয়ী হয়েছিলাম দেশপ্রেমকে পুঁজি করে, আর করোনা যুদ্ধে জয়ী হবো মানবপ্রেমকে কেন্দ্র করে। মানবপ্রেমকে পুঁজি করে চলুন আমরা বাস্তবতাকে মেনে নেই।

বিভাগীয় পর্যায়ে কতটুকু কি হয়েছে এটা গবেষণার অপেক্ষা রাখে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে আমরা এক বিশাল সমন্বয়হীনতায় ভুগছি। জাতীয় পর্যায়ে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কোর টিমে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল জরুরী।সারা দেশকে ইন্টার- সেক্টরে নিয়ে আসলে করোনা যুদ্ধে সফলতা আসতো কিন্তু আমরা সেটি করিনি।           

আমরা বারবার জনগণের সামনে বলতে চাই না যে, আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কয়মাস অফিস করেননি, আমাদের সচিববৃন্দকে পাওয়া যায় না। এগুলো কিন্তু সমন্বয়হীনতার এক বিশাল উদাহরণ। চলুন সত্যটা মেনে নেই।

কোন কোন জায়গায় সমন্বয়হীনতায় ভুগছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম কথা ছিল -টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। আমরা কি আজ পর্যন্ত পর্যাপ্ত টেস্ট করাতে পেরেছি? পারলেও সেটা কতটা মানসম্পন্ন?

আমরা জেনেছি, রংপুর বিভাগে ভেন্টিলেটর মেশিন এসেছে কিন্তু সেটা কতটা ফাংশনাল বা নন-ফাংশনাল এটি কিন্তু এখন দেখার বিষয়। আমাদের কোন রকমের কন্ট্রাক্ট -ট্রেসিং বা হট লিংক নেই। আমাদের যে ইনফেকশন, প্রিভেনশন ও কন্ট্রোল বিভাগ রয়েছে তা ভেঙে পড়েছে। কোনধরনের এন্ট্রেস-এক্সিট সিস্টেম নেই। ক্যাপাসিটি বিল্ড-আপ সিস্টেমও দুর্বল।  আমাদের কোন ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস ছিল না। কিন্তু আমরা সত্যকে কতদিন লুকিয়ে রাখবো। এসব করেতো বাংলাদেশের সহজ সরল মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।                    

একত্রিশে ডিসেম্বর করোনা শুরু হয়েছিল বিশ্বে। এখন পর্যন্ত (০৬ জুলাই) আমরা কি করোনাকে ইমার্জেন্সি হিসাবে ঝুলিয়ে রাখবো? এখনো কি আমরা আমাদের  সীমাবদ্ধতাকে ঢেকে রাখব?

আমরা যেটি দেখেছি, করোনা সম্পর্কে প্রচারণার শুরু থেকেই কানাডায় জোরালো ভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ শুরু করলো। প্রতিটি প্রদেশ মনিটরিং এর অধীনে নিয়ে আসা হল। গঠিত হল করোনা নিয়ন্ত্রণে কোর টিম। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হলেন সেই কোর টিমের প্রধান। আর সেজন্যেই এখানে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। আমি মনে করি, কানাডা করোনা যুদ্ধের রোল মডেল।

করোনা সারা পৃথিবীকে লেভেল করে দিয়েছে। সুতরাং সারা পৃথিবীতে করোনা প্রতিরোধে একই নিয়ম মেনে চলতে হবে। আমরা ঢাকায় রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোন করেছি। এখনও আমরা জানি না- কোন জোনের লোকেরা কি করবে? সারা পৃথিবীতে যখন লকডাউন দিচ্ছে আমরা তখন তা শিথিল করছি।

মোহা: আবদুল আলীম মাহমুদ বিপিএম,পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি), রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।
আমাদের দেশে সংক্রমণ রোগ যেটি দেখা দিয়েছে, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।

এটি কিন্তু বাইরে থেকে আসলো, বাইরে থেকে লোকগুলি আসার পরে  এয়ারপোর্টে কোয়ারান্টিনে  রাখার জন্য বলা হলো  তখন এই লোকগুলো যে ভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল এবং যে আন্দোলন করলো সেই ভিডিওগুলো আপনারা সবাই দেখেছেন,  আমিও দেখেছি।

এরপর লোকগুলি বাড়িতে যাওয়ার পর আইসোলেশন থাকলো না। যার যার মতো ঘুরে বেরিয়েছে , ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বাড়িতে বেরিয়েছে  এবং অনেকে বিয়ে-শাদী করেছে।  এভাবে রোগটি আস্তে করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল।

আমাদের দেশে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নির্মূল একটা আইন আছে এটা ২০১৮ সালের নতুন একটা আইন। এই আইনে ৩৫টি ধারা আছে। এই আইনে কোথাও পুলিশকে ইনভল্ভ করা হয় নাই।

এই আইনে রোগ প্রতিরোধ ও নির্মূলের সমস্ত দ্বায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। মহামারি শুরুর সাথে সাথে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছি, সম্মুখ সারিতে থেকে আমরা দ্বায়িত্ব পালন করছি। আজকের পরিসংখ্যান আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশে আক্রান্ত হয়েছে ১১৪৮৯ জন এর ভেতর আমরা ৪৪ জন সদস্যকে হারিয়েছি। আমাদের মোট সুস্থ হয়েছে ৭৫৫৫ জন সদস্য।

এখনো আমাদের প্রায় চার হাজার পুলিশ সদস্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত তারা বিভিন্ন হাসপাতালে বা বাসা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন ছোট্ট একটা ইউনিট এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট ইউনিট  এটি।

আমিই প্রথম পুলিশ কমিশনার এখানকার। ২০১৮ সালে এটির কার্যক্রম ভিডিও  কনফারেন্স এর মাধ্যমে উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধনমন্ত্রী।

আমরাও কিন্তু এখানে বসে নেই, আমরা এখানে যেদিন থেকে দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের রোগি সনাক্ত হয় সেদিন থেকেই আমরা আমাদের কার্যক্রম শুরু করি।

আমরা এই শহরে ১০ লক্ষ মাস্ক বিতরণ করেছি। আমরা এক লক্ষ লিফলেট বিতরণ করেছি, ওয়াটার কামান দিয়ে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করার চেষ্টা করেছি  এবং এখনো আমরা কাজটি করছি।

আমরা মসজিদের মাইক ব্যবহার করে প্রথমে মাইকিং করেছিলাম এরপর আমাদের নিজেদের গাড়িতে মাইক ব্যবহার করেছি  এবং আমাদের এই গাড়িগুলো দিয়ে পুরা শহর ঘুরে মাইকিং করে সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি।

আমাদের এই শহরে ১৭ টা ঢুকার ও বেরহবার পয়েন্ট আছে। আমরা চেষ্টা করেছি মানুষকে আটকানোর জন্য চেক করার জন্য যাতে মানুষ অযথা বের হতে বা ঢুকতে না পারে। আমাদের পাশের জেলা গাইবান্ধায় এই এলাকার প্রথম রোগি শনাক্ত হয়।

আজ রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় ৭৬৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। একটা ভালো খবর দিতে চাই, সারাদেশ যেখানে আক্রান্ত প্রায় এক শতাংশ সেখানে রংপুরে আক্রান্ত ০.৭২ শতাংশ। তারমানে আক্রান্তের সংখ্যা কম এতটুকুতেই আমাদের তৃপ্তি।

এই মহামারীর সময়ে কিন্তু অপকর্ম থেমে থাকেনি। মানুষ চক পাউডার কে ব্লিচিং পাউডার বলে বিক্রি করে সেটিও পুলিশকে দেখতে হচ্ছে। অনুদানের ক্ষেত্রে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর আটটি নাম দিয়ে নিজের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছে, মানুষ অনলাইনে অপপ্রচার চালাচ্ছে সেটিও পুলিশকে দেখতে হচ্ছে ।

এই মহামারিতে যেখানে বাবা ছেলেকে দেখছে না, ছেলে মাকে দেখছে না, ভাই বোনকে দেখছে না সেখানেও বাংলাদেশ পুলিশ এগিয়ে আসছে। এভাবে পুলিশ মানবিকতার স্মরণকালের দৃষ্টান্ত রাখছে।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ পুলিশ পাকিস্তানি কামানের সামনে একটি সাধারন রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন কিন্তু দেশ প্রেম থেকে দাঁড়িয়েছিল। আমরা এদেশের মানুষকে অনেক ভালোবাসি, আমরা আপনাদের বলব আপনারা ঘরে থাকুন বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে বের হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা আপনার পাশে আছে।

এই মুহুর্তে রংপুরের পরিস্থিতি শুনছি,চেষ্টা চলছে আমরা উত্তরনের পথে রয়েছি। কিন্তু আসলে সেটি কিভাবে সম্ভব? আমরা প্রতিদিনের যে সংবাদপত্র খবরে দেখছি যে একধরনের সমন্বয়হীনতা চলছে। আমরা জানি যে, প্রেসক্লাবের যে জায়গাটা সাংবাদিকের,  সেখানেও কিন্তু একধরনের হযবরল পরিস্থিতি চলছে অনেকগুলো পত্রিকা বন্ধ হয়ে আছে অনেক গুলো পত্রিকার সাংবাদিক বন্ধুরা সংক্রমিত হয়েছেন সারা দেশেই। রংপুরের এই পরিস্থিতি আসলে কি আপনি যদি একটু বলতেন? এরকম প্রশ্নের উত্তরে রফিক সরকার, সেক্রেটারী, প্রেসক্লাব,রংপুর জানান,

সাংবাদিকদের মধ্যে রংপুরে বিশেষ করে রংপুর সিটিতে দুইজন সাংবাদিক ইত্যিমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং তারা দুজনই সুস্থ হয়েছেন।

রংপুর বিভাগের মধ্যে ঠাকুরগাওয়ে সংবাদকর্মি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা সুস্থ আছেন এখন । মোটামুটিভাবে বলা চলে যে এখন সাংবাদিকরা  অনেকগুলে পত্রিকা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং সেগুলো কিন্তু বের হতে পারছেনা। লোকাল পত্রিকার কথা আমি বলছি জাতীয় পত্রিকাও অনেক বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলো আসছে না রংপুরে এটা একটা বিষয়। আর একটা বিষয় হচ্ছে যে লোকাল পত্রিকা যেটা আর্নিং সোর্স বিজ্ঞাপন সেই বিজ্ঞাপন গুলো বন্ধ হওয়ার কারনে কিন্তু পত্রিকাগুলো এখন চালাতে পারছেনা।

তিনটা পত্রিকা এখন মাত্র চালু আছে স্থানীয় পত্রিকা বাকি প্রায় ১১ টি পত্রিকার মধ্যে সবগুলো কিন্তু বন্ধ হয়েছে।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা সেটা হচ্ছে যে আমরা এই সময়টাতে বিশেষ করে এই চার মাস করোনাভাইরাস আতংকের কারনে আমদের প্রত্যেকের বাসা থেকে বলে দেয়া হচ্ছে যে, সেফটি ফার্স্ট।

এরকম পরিস্থিতিতে যেটা ঘটছে অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা রিপোর্টিং করতে পারছিনা। বিশেষ করে আমাদের ভিতর এক ধরনের আতংক ভয় কাজ করে যার কারনে গুরুত্বপূর্ন বিষয় আমরা সামনে নিয়ে আসতে পারছিনা।

নতুন পরিস্থিতি একটা নতুন সংকট নতুন বিপর্যয় সেই কারনে আসলে নতুন তৈরি করতে হচ্ছে যার কারনে সমন্বয়হীনতা কথা আসছে।

আর একটা বিষয় প্রত্যেক জেলায় একটি করে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা জরুরী এটা একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয়। সরকার যেহেতু বরছে আমার মনে হয় সরকার এব্যাপারে খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নিবেন।

কারন পিসিআর ল্যাব ছাড়া কিন্তু দ্রুত টেষ্ট ছাড়া আমাদের পরিত্রাণের উপায় নেই।

আর একটা বিষয় হচ্ছে যে, বেসরকারিভাবেও আমি জানি রংপুরে একটি পিসিআর ল্যাব আছে কিন্তু পিসিআর ল্যাবকেও স্বাস্থ্য বিভাগ পরীক্ষা করার অনুমতি দিচ্ছে না সেটাও কিন্তু একটা বড় বিষয়।

ডা. মোঃ মঞ্জুরুল করিম প্রিন্স ,সহযোগী অধ্যাপক, ডার্মাটোলজি বিভাগ প্রথমেই প্যানেলিস্ট ও আমারহেলথ ডটকমকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ এবং রংপুরের সম্প্রসারিত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সম্প্রসারিত অংশ হচ্ছে আমাদের কোভিড হাসপাতাল যে ১০০ বেডের হাসপাতাল। এই দুটি মিলে আমাদের আসলে কোভিড কার্যক্রম রংপুরে চলছে।

আমাদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নন কোভিড যে ব্যাবস্থাপনা এটাতে যেটা রয়েছে আমাদের একটি আরটি কর্নার রয়েছে এবং সে আরটি কর্নারে স্থানীয় যারা করোনা উপসর্গ নিয়ে আছেন তাদেরকে ওই যায়গায় প্রথম দেখা হয়। এবং সেখানে একটি বুথ রয়েছে স্যাম্পল কালেকশনের এবং সেই স্যাম্পল কালেকশন সেখানে করা হয়।

যারা সন্দেহভাজন করোনা আক্রান্ত রোগি তাদের সেখানে দেখা হয়। এবং এরপরে আমাদের যদি কোন সন্দেহভাজন রোগি পেয়ে যায় তাদেরকে আমরা একটি ইয়োলো জোন আছে আমাদের সেই ইয়োলো জোনে আমরা রাখি সেখানে রাখার পরে সেই ইয়েলো জোনো একটি ওয়ার্ড আছে এবং পরবর্তিতে যদি তারা পজেটিভ আসে তাদেরকে আমরা কোভিড হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই।

গনপরিবহন বন্ধ ছিল এবং সরকারি ছুটি যখন ছিল সেই সময় আমাদের হাসপাতালে রোগি মোটামুটি কম ছিল। কিন্তু যখন আবার খুলে দেয়া হল ,গনপরিবহন যখন খুলে দেয়া হল। এখন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগির চাপ দিনদিন  বাড়ছে এবং রোগির চাপ যখন বাড়ছে স্বাবাভিকভাবেই রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দেখা যায় যে,

 বিভিন্ন ওয়ার্ড ভর্তি মেডিসিন, সার্জারি, এসব সমস্ত চিকিৎসা ব্যাবস্থা যেহেতু চলছে এই অবস্থায় দেখা যাচ্ছে যে আমাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে যারা আছে তাদের করোনা উপসর্গ আছে কিনা এটা হয়তো রোগির পক্ষে থেকে বলা হয়নি। কারন একজন রোগি যখন এপেন্ডিসাইট নিয়ে আসবে অথবা তারা জরুরী কোন পেট ব্যাথা নিয়ে আসবে তার যদি জরুরী কোন অপারেশন লাগে তখন তার কাছ থেকে ওই পেট ব্যাথাই গুরুত্বপূর্ন হয়ে যায়।

তার যে কাশি আছে জ্বর আছে বা অন্যন্যা করোনা সিনড্রোম আছে এটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ন নয় অথবা লুকিয়ে রাখে যার জন্য দেখা যায় যে অপারেশন করতে যেয়ে অনেক রোগি কোভিড পজেটিভ এবং তার থেকে দেখা যায় যে আমাদের সার্জন যারা আছেন বা চিকিৎসক তারা আক্রান্ত হচ্ছেন অথবা সিস্টাররা আক্রান্ত হচ্ছেন। এভাবে অনেকেই রংপুরে আমাদের এই সংক্রমন তা বেশি হচ্ছে। এবং মেডিসিন ওয়ার্ডেও কিছু কিছু রোগি অন্য রোগে তারা ভুগছে বা অন্য রোগ নিয়ে আসছে সেই রোগি যে কভিড টেষ্ট করে কোভিড পজেটিভ চলে আসে এবং সেই রোগিকে যারা দেখে সেইক্ষেত্রে দেখাযায় যে তারা অনেক সময় আমাদের চিকিৎসকরা আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা তারাও সেই কারনে কোভিড আক্রান্ত হচ্ছে।

আমাদের এখানে একটি জিনিস ভাল যে রংপুরে যে কোভিড হাসপাতাল আছে এই কোভিড হাসপাতাল আমরা জানি যে ১০০ বেডের হাসপাতাল এবং ১০ টি আইসিউ বেড আছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন আছে এবং সেখানে এ পর্যন্ত প্রায় ১৮০ জন রোগি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে এবং সেখানে এখন ভর্তি আছে প্রায় ৩৯ জন রোগি।

আমাদের ওই হাসপতালে যারা চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন তাদের কিন্তু হাসপাতার সম্পর্কে মনোভাব অত্যন্ত ভাল । এবং তারা সবাই তাদের চিকিৎসা সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েই সেখানে গিয়েছে। তবে উল্লেখ্য হাই ফ্লো নেজাল ক্যানুলা দরকার, এবং তার আবেদন করা হয়েছে। নিশ্চয়ই সেটি অচিরেই পাওয়া যাবে।

এখন কভিড হাসপাতালে আরো কিছু সমস্যা রয়েছে , আমাদের জনবলের অভাব রয়েছে এবং চিকিৎসক যে পরিমান থাকার কথা সেই পরিমান চিকিৎসক এখনো নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।

রংপুর জেলায় শুধু ১৮০টি টেস্ট হয় প্রতিদিন। যদি তাই হয় তাহলে এই যে বাকি যারা কিউতে থাকছে, আমরা জানি তিন দিন পরে স্যাম্পল এর গ্রহণযোগ্যতা থাকে না । সেটি নেগেটিভ টেস্ট রিপোর্ট আসার সম্ভাবনাই বেশি। তাহলে উত্তরণের উপায় কিভাবে বের করব? উত্তরে ডা. হিরম্ব কুমার রায়, সিভিল সার্জন, রংপুর বলেন, আমি একজন আশাবাদী মানুষ। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেয়ে আমি এ পর্যন্ত এসেছি, নিরাশ হতে চাই না।
প্রথমে যে কথাটি এসেছে সেটি সমন্বয়ের অভাব। আসলে রংপুর জেলাতে কোন সমন্বয়ের অভাব নাই। এখানে করোনা ইনফেকশনের প্রথম থেকে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি তৈরি করা হয়েছে মাননীয় জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে। এবং এটি সুন্দরভাবে কাজ করে যাচ্ছে বিভিন্ন সমন্বয়ের মাধ্যমে। আমরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা পরিচালনা করছি আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের কোন অভাব নেই। রংপুরে আরটিপিসিআর মেশিন মাত্র একটি আছে। প্রতিদিন ১৮৮ টি টেস্ট করা হয়।
আমার জানামতে বিভাগীয় কমিশনার মহোদয় যেভাবে চেষ্টা করছেন আরটিপিসিআর মেশিন রংপুরে লঞ্চ করার জন্য। আশা করি উনি সফল হবেন। আর প্রাইভেট ল্যাব এ আরটিপিসিআর মেশিন আছে একটা। সেটা এপ্লাই করেছিল টেস্টের জন্য কিন্তু আমাদের ইনভেস্টিগেশনে দেখা গেছে বায়োসেফটি প্রিপারেশন তাদের দুর্বল। এবং ল্যাবটি জনবহুল এলাকায় অবস্থিত ওখানে পারমিশন দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এভাবে নীতি নির্ধারনী অনেক বক্তব্য ও সমন্বয়ের দাবি উথ্থাপণ করেন বক্তারা প্রায় সকলেই। একথাটি প্রতীয়মানহয় যে অন্তরিকতার একেবারেই অভাব নেই, রংপুর বিভাগের সকল সম্মুখ যোদ্ধার- বুকে রয়েছে যুদ্ধ জয়ের মনোবল।

আমারহেলথ ডটকম তাই রংপুর বিভাগের সকল সাধারন মানুষ ও সামনের সারির সকল যোদ্ধাদের সম্মান জানায় এবং সংগ্রামে সহযাত্রী হিসাবে আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করে। আমরা সকলে মিলে এই যুদ্ধ জিতবো, করোনাশহিদদের প্রতি সবাই তাই  জানাই শ্রদ্ধা এবং করোনা আক্রান্তদের প্রতি সহানুভুতি ও সমবেদনা। সবাই মানবিক হলেই করোনামুক্ত হবে পৃথিবী।

সর্বাধিক পঠিত খবর


ঘর থেকেই বেশি ছড়াচ্ছে করোনা: গবেষণা



মা'কে হারালেন সাদিয়া ইসলাম মৌ