শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০

English Version

করোনার বিরুদ্ধে একা লড়াই

No icon লেখালেখি

অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরীর কলম থেকে।  ২৮ মে ২০২০:

এক বিদেশি মেয়ের খেরো খাতা থেকে

নাম আর ঠিকানা অনুলেখ্য থাক।

কো ভি ড ১৯ এর বিরুদ্ধে আমার লড়াই এর মাঝে একসময় আমার মনে হল আমি বোধ হয় মরতে যাচ্ছি । এর চেয়ে খারাপ হল আমি হয়ত মরব একা, কেউ নেই। যারা একা বাস করে তাদের মনে এই চিন্তা আসে কিছু ভয়ানক ঘটলে কাকে ডাকা হবে, কে আসবে সাহায্যের জন্য । এই ভয় আমার জন্য এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হয়ে দেখা দিল

কো ভি ড ১৯ একটি নিঃসঙ্গ বাসের অসুখ । প্রত্যেককে কিছু মাত্রায় নিজে নিজে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় । অন্যদের সঙ্গে থাকলে ও  নিজে একটি অন্য কক্ষে একাকি থাকতে হয় । আমি একা থাকি তাই আমাকে একা একা মানসিক , শারীরিক ,আবেগিক  সব লড়াই করতে হয় একা । আমি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মেয়ে মনে করি একা একা চলি , পৃথিবীর ৫০ টি দেশে ঘুরেছি আর নিজের দেখ ভাল একা করেছি । কিন্তু একা এই এপার্টমেন্ট এ আমি একা একা এই ভয়ঙ্কর লড়াই করব ! আমার জীবনের সব চেয়ে কঠিন আর ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ।

দিনের পর দিন আমার শ্বাস ক্রিয়া নিয়ে কষ্ট । প্রতিটি শ্বাস আমি নিচ্ছি কি অগভীর আমার ঘুমাতে ভয় যদি ঘুম থেকে জেগে না উঠি? সে সঙ্গে জ্বর মাঝে মাঝে মাথা ঝিম ঝিম কাপুনি, নিউমোনিয়া খুব পিপাসা, মৃদু পিঙ্ক আই , গায়ে রেশ , ক্ষুধা মান্দ্য  গন্ধ চেতনা চলে গেছে আর ভয়ানক উদ্বেগ ...।

এত দুর্বল শরীর আমার কখনও হয়নি মনে হচ্ছে আমার শরীরের ১০ শতাংশ বাকি আছে । আমার ঘরের দরজার বাহিরে কি কেউ আছে যে আমাকে নিশ্চিত করবে আমি বেচে আছি?

খুব খারাপ দিন যাচ্ছে আমার তবু আমি উঠে দাঁড়ালাম, শাওয়ার নিলাম মাথা কি ঘুরে উঠলো আমি পড়ে গেলাম? কিছু জানিনা । এবার এক সময় চেতনা ফিরে পেলাম । ভাবলাম একা লড়াই হবে না নিতে হবে সাথে কাউকে ।

সংযুক্ত থাকার জন্য প্রযুক্তি ভরসা ।

আমার সৌভাগ্য আমার আছে চমৎকার পরিবার দুই ভাই, একজন বোন, মা আর বাবা । তাদের সঙ্গে করি ভিডিও চ্যাট করোনা ভাইরাসের আবির্ভাবের আগে এমন চ্যাট করিনি । এখন ভিডিও চ্যাট আমার লাইফ লাইন । এটি ধীরে চলা ভাইরাস! আমার কি হবে ভবিষ্যতে ভেবে পাইনা । আমি টেলি মেডিসিনের উপর নির্ভর করে আছি । ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ চলে আর ভিডিও চ্যাটে কথা বার্তা চলে পরিবারের সবার সাথে । আমার অসুখের অগ্রগতি মনিটার হয় আমার কত টুকু উন্নতি হচ্ছে শুনি

ফেস টাইমের মাধ্যমে আমার বোন আমাকে শেখায় ব্রিদিং ব্যায়াম । আমি ভয় পাই আবার যদি বাথ রুমে পড়ে যাই? আমি আই ফোনে ওকে বলে শাওয়ার নিতে যাই ও যুক্ত থাকে আমি আই ফোন রাখি তখন স্নান ঘরে ।

সামাজিক মাধ্যমে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে অন্যদের সাথে যুক্ত হই । প্রথমে মনে দ্বিধা ছিল পরে মনের জড়তা কাটিয়ে ফেস বুকে আমার অভিজ্ঞতা বলি অন্যকে করোনা কালে সাহায্যের অফার দেই । চমৎকার হল সেই সাড়া অনেকের ভালোবাসা, সাপোর্ট, পরামর্শ,প্রার্থনা যা পেলাম তা অবিশ্বাস্য

কি আশ্চর্য উপহার । নিজেকে জনগোষ্ঠী র মধ্যে পাওয়ার এক বিশাল আনন্দ আছে, আমার দুর্বলতার গভীরে কি প্রচণ্ড শক্তি আসে ...। আমি সাড়া দেই, কেউ কল করলে কথা বলি মেসেজ দিলে উত্তর দেই আর সন্ধ্যা সাতটায় তাই করোনার সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের জন্য নাগরিক করতালি দেওয়ার সাথে আমিও অংশ গ্রহণ করি ।আমি জানি যে কোন ভাবে পাই আমাকে আহরণ করতে হবে বেচে থাকার শক্তি আর সাপোর্ট ।

সামাজিক ভাবে দূরে হলেও সাহায্য দিলে গ্রহণ করা উচিত

নিঃসঙ্গ বোধ করছেন? কিন্তু ভাবুন আপনি একা নন । চারপাশ চেয়ে দেখুন । কেউ আপনাকে সাহায্যের হাত বাড়ালে গ্রহন করুন, সাহায্য লাগলে চাইতে হবে । লজ্জা নয় । আমার জন্য এ বড় কঠিন ছিল । আমার এই বয়সে মা বাবার কাছে চাইব মন মানছিল না । আমার ওজন দ্রুত কমছিল কিন্তু সে ব্যাপারে কিছু করতে পারছিলাম না । ।আমার মা বাবা থাকেন যেখানে আমার বাসা থেকে ৩০ মিনিটের ড্রাইভ ,আমার  ৭৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা আর ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা চিকেন সুপ , পুষ্টিকর খাবার আমার ভাই তৈরি করেছিল ফল সব ব্যাগে করে রেখে গেল আমার বাসার বাইরে রেলিং এ ঝুলিয়ে । নিচে নামলাম সব স্বাস্থ্য সতর্কতা মেনে, মাস্ক গ্লভস পরে ডিসইনফেকটেনট  ছড়িয়ে  বেশ ক্লান্তি লাগলো যদিও । আমার ওজন কমেছে ১৭ পাউন্ড তবু আমি ভেবে সুখ পেলাম আমার পরিবার আমাকে ভাল রাখার জন্য যে চেষ্টা করল , দূর থেকে আমার শুশ্রূষা করল সাধ্যমত

শরীরের সাস্থ্যর সাথে সাথে মনের স্বাস্থ্য কে দিতে হবে অগ্রাধিকার

ভাইরাসটি মনের উপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করে আমার অসুস্থ অবস্থায় আমি ভাবি আমার মনের খেয়াল রাখতে হবে । টেলি ভগিশনে একটি কো ভি ড স্টোরি শুনি ভয়ে আতঙ্কে আমার শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায় ।আমি প্রকৃতি আর প্রাণীর উপর ফিল্ম দেখি , দেখি ন্যাশন্যাল জিও গ্রাফিক আর মনে করি বন্ধুদের কথা "দেখ তুই ভাল হয়ে যাবি " " মনে জোর রাখ " তুই ভাইরাসের চেয়েও  বেশি শক্তি শালী " আমার মনে আছে একদিন সন্ধায় আতঙ্ক আমাকে চেপে ধরছিল ভাবছিলাম রাত পার হবে না এই আমার শেষ , আমি ফোন করলাম মা আর বাবাকে । বাবা একজন মনো বিজ্ঞানী ,   বাবাকে বললাম রাতে ঘুমুতে পারছিনা ভয়ে যদি সকালে ঘুম থেকে জাগতে না পারি । বাবা আমাকে পরামর্শ দিলেন কি করে রাতের ভয় কাটাতে হবে । এ থেকে আমার শিক্ষা হল জীবনে আমি অবিশ্বাস্য যে সাপোর্ট পেলাম আমার যখন শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায় আমরা যেন সে সব পজিটিভ অবলম্বন আর শক্তি খুজে নেই তাদের কাছ থেকে।

এভাবে গেল ২৬ দিন আমি এখনও মাত্র ৬০ শতাংশ তৈরি আরও নিজেকে আগের মত করার চেষ্টায় আছি । আমি শুনছি আরও দু হপ্তা লাগবে পুরো সেরে উঠতে । লক্ষণ উপসর্গ যত তীব্র প্রচণ্ড সারতে সময় লাগে বেশি ।

ভাইরাস আমার প্রচণ্ড সেই ভয় কে উসকে দিয়েছিল একাকী মৃত্যু আর সে ভয় আমাকে এখনও নাড়ায়  কবে এ ভয় যাবে জানিনা আমি ধৈর্য ধরি,নিজেকে সামলাই ।

আমার দ্বিতীয় বার টেস্টের ফল এলো নিগেটিভ ডাক্তার বললেন বাইরে যেতে পারি কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে তবু নিঃসঙ্গতা আমাকে ছাড়েনা অন্য যারা একা থাকে তাদের মতই ।তবে আমি সুখী আমি সেরে উঠেছি পেয়েছি পরিবার আর  বন্ধুদের ভালবাসা  সাপোর্ট আর কেয়ার । আবার একদিন সবাই আমরা মিলবো আনন্দ মেলায় ।

লেখক- স্বাস্থ্য কথা সাহিত্যিক।

সর্বাধিক পঠিত খবর