বুধবার, ২০ জুন ২০১৮

English Version

তথ্যপ্রযুক্তি ও আমাদের ধারণা

No icon লেখালেখি

ডা.অপূর্ব পন্ডিত।। ৮ মার্চ’১৮-- থাকব না আর বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে। কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সংকল্প’ কবিতার সেই লাইন আজ জীবন উত্তোরণে প্রধান অঙ্গীকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যান্ত্রিকতার এ যুগে প্রতি মুহুর্তে নিজেদেরকে প্রযুক্তি নির্ভর হতে হচ্ছে। কেননা- পৃথিবী এগিয়ে চলছে। এগিয়ে চলেছি আমরা।

তথ্যপ্রযুক্তি, ছোট একটা শব্দ। কিন্তু, আমাদের জীবনে এর ভূমিকা অপরিসীম, এককথায়, অনস্বীকার্য। পৃথিবীর দু’মেরুর দুজন বাসিন্দাকে তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে এক ছাতার নীচে। 

মোবাইল ফোন: ক্রিং ক্রিং শব্দের ল্যান্ড ফোনের যুগ পেরিয়ে আমাদের হাতে হাতে এখন মোবাইল। ইচ্ছেমতো গান রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ সহ কি নেই মোবাইলে? এক ক্লিকেই পুরো পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে এই মোবাইল ফোন।

 

দিদিমার পুজোর মন্ত্র, মায়ের ফোড়নের সাত-সতেরো, বাবার অঙ্ক শেখানোর ফর্মুলা, কাছাকাছি রেস্তোরাঁ থেকে নিজের খাবারের অর্ডার, ওজন, হৃদয়ের অবস্থা- সবকিছুই হাল্কা ‘টাচ-এ জেনে ফেলার এক মজার যন্ত্র এই স্মার্টফোন!  মজার মজার সব গেম, ডিজিটাল মেগাপিক্সেল ক্যামেরা আর অভিনব সব নতুন নতুন এ্যাপস সহ আইফোন ১০ এখন আমাদের হাতের নাগালে টেলিভিশান, রেডিও, ভিডিও কলিং সুবিধা কি নেই এসব আইফোন, ট্যাব এ।

পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন এগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তথ্যপ্রযুক্তি আজ প্রচারণার শীর্ষে । কাগজের চিঠি হারাতে বসেছে। ফোন আর কম্পিউটারের সংমিশ্রণে তথ্য প্রযুক্তি যোগাযোগ ক্ষেত্রে  এনেছে আমূল পরিবর্তন।

এযুগের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজনীয় কম্পিউটার নামের এই যন্ত্রটির আধুনিক রূপ কিন্তু একদিনে পায়নি। এর জন্য যুগ যুগ ধরে বিশেষজ্ঞদের অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। এরমধ্যে বারংবার এ যন্ত্রের পরিবর্তনও ঘটেছে। সবশেষে আজকের এ আধুনিক রূপ পেয়েছে এবং এর ব্যবহারও সহজ হয়েছে।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার বছর আগে চীন দেশে গণনা কাজের জন্য এক ধরণের যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। যার নাম ছিল এ্যাবাকাস ।  এই এ্যাবাকাস থেকেই আধুনিক ক্যালকুলেটর তৈরীর ধারণা এসেছে । এই যন্ত্রে গণনার কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো কতগুলো গোল চাকতি। এই চাকতি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গণনার কাজ সম্পন্ন করা হতো। এ্যাবাকাস আবিষ্কারের পর পার হয়ে যায় কয়েক হাজার বছর। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের চিন্তা চেতনা, জ্ঞান ও জানার ক্ষেত্রও হয়ে উঠে বড়ো ও উন্নত। প্রথম যান্ত্রিক গণনা যন্ত্র তৈরি হয় ১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দে। স্যার ব্লায়াস প্যাসকেল নামের একজন ফরাসি বিজ্ঞানী এটা তৈরি করেন। বিজ্ঞানীর নামানুসারে এই যন্ত্রের নাম দেওয়া হয়েছিল প্যাসকেলাইন। এটার কার্যপ্রণালী কিন্তু ছিল এ্যাবাকাস এর মতই। তবে এতে চাকতির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছিল দাঁতযুক্ত চাকা বা গিয়ার। মানুষ প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ব্যবহার করলো এই যন্ত্র।

১৬৯৪ সালের দিকে প্যাসকেলাইন যন্ত্রের কিছুটা উন্নত সংষ্করণ তৈরি করলেন গটফ্রেড উইলহেম ভন লেইবনিজ। এই যন্ত্রে নাম দিলেন তিনি স্টেপড রেকোনার। পেরিয়ে গেল প্রায় আরও সোয়া এক’শ বছর। ১৮২০ সালের মাঝামাঝি স্টেপড রেকোনার যন্ত্রকে আরও একটু উন্নত করলেন টমাস দ্যা কোমার। ততদিনে মানুষও বেশ আধুনিক হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির দিকে তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আর এরই ফলশ্রুতিতে ১৮২১ সালে ঘটে গেল এক বিপ্লব।

চার্লস ব্যাবেজ নামের একজন ইংরেজ গণিতবিদ অংকের বিভিন্ন তথ্যের সহজ সমাধানের জন্য তৈরি করে ফেললেন একটি যন্ত্র। যার নাম দেওয়া হলো ডিফারেন্স ইঞ্জিন।

১৮৯০সালে ডঃ হারম্যান হলোরিথ নামের একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার চার্লস ব্যাবেজের যন্ত্রের সাথে টেবুলেটর নামের একটি যন্ত্র জুড়ে দিলেন।

তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করলেন একটি কোম্পানী। নাম দিলেন টেবুলেটিং মেশিন কোম্পানী। এই কোম্পানীই পরবর্তীতে আইবিএম নামে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কম্পিউটার কোম্পানী হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

এখন একটা কম্পিউটার রাখার জন্য একটি ছোট্ট টেবিলই যথেষ্ট। ১৯৪৮ সালের শেষদিকে বারডিন, ব্রাটান এবং শকলি নামের তিন প্রতিভাবান আমেরিকান বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করলেন ট্রানজিষ্টার। ফলে কম্পিউটার দিগন্তে সূচিত হলো এক নতুন বিপ্লবের।

১৯৭১সালে ছোট্ট একটুকরো সিলিকন চিপের উপর অনেকগুলো ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বসানো সম্ভব হয়ে ওঠে। এই সন্নিবেশিত চিপের নাম দেওয়া হয় মাইক্রোপ্রসেসর। বর্তমানে আধুনিক কম্পিউটার এই মাইক্রোপ্রসেসরের উপর নির্ভরশীল।

তারপর থেকে উদ্যমী মানুষ একের পর এক উন্নতির সোপানে পা রাখতে শুরু করে। একসময় যে কম্পিউটারকে রাখতে হতো বিশাল এক হলরুমের মতো একটি ঘরে। এখনকার একটি কম্পিউটারকে একটি ছোট্ট টেবিলেই রাখা যাচ্ছে। শুধুকি তাই? এখন ছোট্ট কোল জুড়ে রাখা যায় এই কম্পিউটারকে। যার নাম ল্যাপটপ কম্পিউটার। এছাড়াও আছে হাতের তালুতে  রেখে কাজ করার মতো কম্পিউটার নাম যার পামটপ কম্পিউটার ইত্যাদি। কম্পিউটারের হাত ধরেই আজ ইন্টারনেট দখল করে নিয়েছে ফোনালাপ, ভিডিও কনফারেন্সিং সহ  রেডিও টেলিভিশনের অনেক কাজ। পুরোনো সেই চিঠি লেখালেখিকে পিছনে ফেলে এখন ইমেইল আর ভিডিও কল চলছে দেদারসে। 

 সাদাকালো এনালগ টেলিভিশনের যুগতো  কবেই শেষ এখন সব এলসিডি, এলইডি রঙিন টেলিভিশন সাথে যোগ হয়েছে থ্রিডি ফোর ডি টেকনোলোজির টেলিভিশন প্রযুক্তি।  এমনকি কম্পিউটারেই চলে এখনকার টেলিভিশন। 

প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ও বিস্ময়কর অবদানটি হচ্ছে রোবট বা ‘রোবট প্রযুক্তি’। রোবট সাধারণত একটি ইলেক্ট্রো-যান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার কাজকর্ম, কাঠামো ও চলাফেরা দেখে মনে হয় সেটি নিজের ইচ্ছায় কাজ করছে, কারো দ্বারা এটি প্রভাবিত হচ্ছে না। মূলত, রোবট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একটি প্রোগ্রাম বিশেষ। যার পরিবেশ বুঝে কাজ করার ক্ষমতা আছে এবং যা দক্ষভাবে সুনিয়ন্ত্রিত চলন প্রদর্শন করতে পারে।

কিছু রোবট বিমান তৈরি করেছে এখন অনেক দেশ। যাদেরকে সংক্ষেপে বলা হয় ড্রোন। এই রোবট বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো রূপ সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হয় না।

 এটি অটোপাইলট ব্যবহার করে পরিচালিত হয় এবং ভ্রমণের প্রতিটি পর্যায়ে নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। কিছুদিন আগে যদিও সেগুলোকে শুধু শত্রুর উপর বোমা হামলায় ব্যবহার করা হতো তবে এখন মালামাল প্রেরণের ক্ষেত্রেও বহুল ভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে এই ড্রোন।

আমাদের আজকের সভ্যতা গড়ে উঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদানটি হচ্ছে এ প্রযুক্তির। পৃথিবীর কোন এক কোণায় বসানো সার্ভার থেকে আপলোড করা তথ্যটি আজ তাই ইন্টারনেটের বদৌলতে ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো পৃথিবীতে। ফেসবুক, গুগল প্লাস এরকম বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া, ওয়েব এপ্লিকেশনের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তি তাই পুরো বিশ্বকে নিয়ে এসেছে এক ছাতার নীচে।

 

 

সর্বাধিক পঠিত খবর

ফলে স্টিকার থাকার কারণ



সায়াটিকার ব্যথা ও চিকিৎসা




ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা বন্ধে করণীয়